Health Tips

Showing posts with label ডায়াবেটিস কী. Show all posts
Showing posts with label ডায়াবেটিস কী. Show all posts

 

ভাত বেশি খেলে কি ডায়াবেটিস হয়?

অনেকে ভাবেন বেশি বেশি ভাত খেলেই ডায়াবেটিস হয়! কিন্তু এই রোগের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক বিষয়। অস্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা, বাইরের খাবার খাওয়ার প্রবণতা, কায়িক শ্রম কম করা, তেল-মশলাদার, মিষ্টির মতো খাবার বেশি খাওয়ার অভ্যাসেও শরীরের বাসা বাঁধতে পারে ডায়াবেটিস।


ভাত খাওয়ার বিষয়ে চিকিৎসকরা বলছেন, এই রোগ হলেও ভাত খাওয়া যেতে পারে। ছবি: সংগৃহীত

স্বাস্থ্য ডেস্ক

২ মিনিটে পড়ুন

ভাত খাওয়ার বিষয়ে চিকিৎসকরা বলছেন, এই রোগ হলেও ভাত খাওয়া যেতে পারে। তবে সাদা ভাত নয়। রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাদা ভাতের পরিবর্তে ভরসা রাখতে পারেন ‘ব্ল্যাক রাইস’-এ। অনেকেই হয়তো জানেন না, এই চালের ভাত ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য একটি স্বাস্থ্যকর বিকল্প। ব্ল্যাক রাইসের পুষ্টিগুণ অনেক।

 
১) ব্ল্যাক রাইসে ফাইবার এবং প্রোটিনের পরিমাণ অনেক বেশি। ফলে রক্ত শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইলে ব্ল্যাক রাইস হতে পারে অন্যতম ভরসা।
 
২) ডায়াবেটিস হলে ওজন বেড়ে যাওয়ার একটা আশঙ্কা থাকে। যারা এই রোগে ভুগছেন এমন অনেকেরই ওজন স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি। রক্তে শর্করার মাত্রার পাশাপাশি ওজনও নিয়ন্ত্রণে রাখতে রোজের পাতে সাদা ভাতের পরিবর্তে রাখতেই পারেন ব্ল্যাক রাইস।

৩) গ্লুটেন আছে এমন খাবার এড়িয়ে চলার কথা বলে থাকেন চিকিৎসকরা। কারণ গ্লুটেনযুক্ত খাবার এমন রোগীদের শরীরে নানা রকম বাড়তি অসুস্থতার জন্ম দেয়। ব্ল্যাক রাইসে গ্লুটেন নেই। ডায়াবেটিস ধরা পড়লে অনায়াসে খেতে পারেন এই চালের তৈরি ভাত।
 
৪) টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতেও ব্ল্যাক রাইস কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। ফাইবার এবং ম্যাগনেশিয়াম-সমৃদ্ধ ব্ল্যাক রাইস ডায়াবেটিসের সঙ্গে লড়তে হাতিয়ার হতে পারে। ফলে টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে পারে ব্ল্যাক রাইস।

তবে সকলের ক্ষেত্রে ব্ল্যাক রাইস স্বাস্থ্যকর ভূমিকা পালন করে না। ডায়াবিটিসের সঙ্গে সঙ্গে কারও যদি হৃদ্‌রোগ, গ্যাস বা শারীরিক অন্য কোনও সমস্যা থেকে থাকে, তা হলে কিন্তু এই চালের ভাত না খাওয়াই ভাল।

আবার একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, গরম ভাত খাওয়ার পরিবর্তে ডায়াবেটিস রোগীরা যদি ঠান্ডা ভাত খান, তাহলে তাদের রক্তে সুগারের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। গবেষণা চলাকালীন, রোগীদের দুটি ভিন্ন ধরণের খাবার দেয়া হয়েছিল। খাবারের আগে গবেষকরা এই সব রোগীর রক্তে সুগারের মাত্রা মেপে নেন। রোগীদের প্রথমে লম্বা দানা সাদা চালের গরম ভাত খেতে দেয়া হয়েছিল। আর পরের দিন আগের দিনের গরম ভাত ২৪ ঘণ্টা ফ্রিজে রেখে আবার গরম করে রোগীদের খেতে দেয়া হয়।
 

গবেষকরা দেখেছেন যে রোগীরা যখন ঠান্ডা ভাত খেয়েছিলেন, তাদের রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে ছিল। গরম রান্না করা ভাত খাওয়ানোর পরই তাদের রক্তে সুগারের মাত্রা দ্রুত বাড়তে দেখা যায়। গবেষণা শেষে জানা গিয়েছে, খাবারে ভাতের মতো কুল কার্বোহাইড্রেট অন্তর্ভুক্ত করে রক্তে সুগারের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এই গবেষণায় গবেষকরা দেখেছেন যে গরম ভাতের তুলনায় ঠান্ডা ভাতে প্রতিরোধী স্টার্চ বেশি পাওয়া যায়। প্রতিরোধী স্টার্চ হজম হতে অনেক সময় নেয়। ফলস্বরূপ, ফাইবারের মতো প্রতিরোধী স্টার্চ রক্তে শর্করার মাত্রা ঠিক রাখতে সাহায্য করে।

 

কিশোর-তরুণদের বাড়ছে ডায়াবেটিস, করণীয় কী?

দেশে আশঙ্কাজনক হারে কিশোর-তরুণদের মধ্যে বাড়ছে ডায়াবেটিস। ডায়াবেটিস প্রতিরোধে কায়িক পরিশ্রম, স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাস, ওজন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সবাইকে পরীক্ষার আওতায় আনার ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।


ফারুক ভূঁইয়া রবিন

২ মিনিটে পড়ুন

২৫ বছর বয়সী শাহীন। ছয় মাস আগে অন্য একটি রোগের সার্জারির কারণে ডায়াবেটিস পরীক্ষা করতে বলেন চিকিৎসক। আর তাতেই ধরা পড়ে রোগটি। অথচ তেমন কোনো লক্ষণ প্রকাশ না পাওয়ায় জানতেনই না ডায়াবেটিসে আক্রান্ত তিনি।

শাহীন বলেন, নাকের সার্জারি করতে গিয়েছিলাম। তখন ডাক্তার বললেন, ডায়াবেটিস পরীক্ষা করতে। পরীক্ষা করার পর ডায়াবেটিস ধরা পড়ে।

একাদশের শিক্ষার্থী ইভার গল্পটাও একই। দেখা দেয়নি কোনো লক্ষণ, কিন্তু বাবা-মায়ের ডায়াবেটিস থাকায় গত বছর পরীক্ষা করতে গিয়ে জানতে পারেন তিনিও আক্রান্ত। বলেন, ‘ডায়াবেটিস শনাক্ত হওয়ার আগে কোনো লক্ষণ আমি পাইনি।’

আরও পড়ুন: সাইকেলিং না দৌড়ানো, কোনটি বেশি উপকারী?

বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সেন্টার ফর গ্লোবাল হেলথ রিসার্চের এক জরিপ বলছে, দেশের ১৫-৩৫ বছর বয়সীদের মধ্যে ৭ শতাংশই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। এর মধ্যে ৬১ শতাংশের মধ্যেই প্রকাশ পায়নি কোনো উপসর্গ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবারের কোনো সদস্যের ডায়াবেটিস থাকলে তরুণদেরও আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাত্রার পরিবর্তন, স্থূলতা, কায়িক পরিশ্রম না করা ডায়াবেটিসের অন্যতম কারণ। আর ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারলে পরবর্তীকালে ঝুঁকি বাড়ায় অন্যান্য জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার।

তারা আরও বলছেন, ঘনঘন প্রস্রাব হওয়া, পিপাসা লাগা, দুর্বলবোধ, ক্ষুধা বেড়ে যাওয়া এবং হঠাৎ ওজন কমে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। আর যেহেতু অনেকেরই প্রাথমিক অবস্থায় উপসর্গ প্রকাশ পায় না, সে জন্য সবাইকেই পরীক্ষার আওতায় আনা উচিত।

আরও পড়ুন: নতুন আতঙ্ক মাঙ্কিপক্স: প্রয়োজনীয় সতর্কতা জানাল ইউকেএইচএসএ

ডায়াবেটিস প্রতিরোধে কায়িক পরিশ্রম, পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাস, সবুজ শাকসবজি, ফলমূল ও আঁশযুক্ত খাবার খাওয়ার পরামর্শ চিকিৎসকদের। পরিহার করতে হবে ফাস্টফুড, কোমল পানীয়, প্রক্রিয়াজাত খাবার, অতিরিক্ত লবণ। নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে ওজন।

 

ডায়াবেটিস কী? জেনে নিন এর সম্পূর্ণ তথ্য - লক্ষণ থেকে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা



ডায়াবেটিস কী?

ডায়াবেটিস হল শরীরের এমন একটি গুরুতর অবস্থা, যখন আমাদের শরীর নিজে থেকে ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না বা তৈরি হওয়া ইনসুলিন দক্ষতার সঙ্গে (কার্যকরভাবে) ব্যবহার করতে পারে না। এর ফলে রক্তে শর্করার বা গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হয়।

ইনসুলিন মানুষের শরীরের কোষগুলি তে শর্করা প্রবেশ নিয়ন্ত্রন করে। অর্থাৎ একটি "চাবি" হিসাবে কাজ করে। এর দ্বারা আমাদের খাবার থেকে যে চিনি বা শর্করা (গ্লুকোজ) পাওয়া যায়, তা রক্তের মধ্য দিয়ে বাহিত হয়ে কোষের মধ্যে প্রবেশ করতে পারে। তারপর, কোষ শরীরের প্রয়োজনীয় শক্তির জন্য সেই গ্লুকোজ ব্যবহার করে। ইনসুলিন তৈরি হয় অগ্ন্যাশয়ের বিশেষ কোষ দ্বারা তৈরি হরমোন আইলেটস (আই-লেটস) থেকে। ডায়াবেটিস-জনিত ইনসুলিনের তারতম্যের জন্য আমাদের রক্তে শর্করার মাত্রার তারতম্য ঘটে। শরীরে বেশ কিছু অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়।

ডায়াবেটিসের ধরণ:

  • টাইপ 1
  • টাইপ 2

টাইপ 1 এবং টাইপ 2 হল ডায়াবেটিসের দুটি সাধারণ রূপ। এছাড়া অন্যান্য ধরণেরও ডায়াবেটিস হতে পারে, যেমন গর্ভকালীন ডায়াবেটিস, নিওনাটাল ডায়াবেটিস, জেসটেসানাল ডায়াবেটিস ইত্যাদি।

ডায়াবেটিস এর লক্ষণ

  • টাইপ 1 ডায়াবেটিসের লক্ষণ:

টাইপ 1 ডায়াবেটিস-এর সূত্রপাত খুব দ্রুত ঘটে এবং নিম্নলিখিত উপসর্গ গুলি হঠাৎ দেখা দিতে পারে:

  • তীব্র তৃষ্ণা 
  • অতিরিক্ত প্রস্রাবের প্রবণতা
  • দ্রুত ওজন হ্রাস
  • প্রচণ্ড ক্ষুধা
  • দুর্বলতা বা ক্লান্তি
  • অস্বাভাবিক বিরক্তি
  • ঝাপসা দৃষ্টি
  • বমি বমি ভাব 
  • পেটে ব্যথা
  • অপ্রীতিকর গন্ধের অনুভূতি
  • চুলকানি

 

  • টাইপ ২ ডায়াবেটিসের লক্ষণ :

ডায়াবেটিসের সবচেয়ে সাধারণ রূপটি কে টাইপ 2 ডায়াবেটিস বা ইনসুলিন-অনির্ভর ডায়াবেটিস বলা হয়। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত প্রায় 90% লোকের টাইপ 2 ডায়াবেটিস হয়ে থাকে। টাইপ 2 ডায়াবেটিস কে প্রাপ্তবয়স্ক সূচক (adult-onset) ডায়াবেটিস-ও বলা হয়, কারণ এটি সাধারণত 35 বছর বয়সের পরে প্রকাশ পায়। তবে, ইদানিং ক্রমবর্ধমান সংখ্যক অল্পবয়স্ক মানুষদের-ও টাইপ 2 ডায়াবেটিস হচ্ছে।

টাইপ 2 ডায়াবেটিস আক্রান্ত ব্যক্তিরা নিজস্ব ইনসুলিন তৈরি করতে সক্ষম। কিন্তু প্রায়শই, এটি পরিমাণে যথেষ্ট নয় বা কোষ যথাযথ ভাবে প্রতিক্রিয়া করে না। অর্থাৎ ইনসুলিন শরীরের কোষগুলিকে খোলার জন্য চাবি হিসাবে সঠিক ভাবে কাজ করতে পারে না। ফলে শর্করা কোষে প্রবেশ করতে পারে না। একে বলা হয় ইনসুলিন-রেজিস্ট্যান্স। টাইপ 2 ডায়াবেটিস সাধারণত স্থূলকায় ব্যাক্তি এবং ব্যায়াম-রহিত (sedentary) জীবনধারার অভ্যস্ত ব্যাক্তি দের হয়ে থাকে। 

টাইপ 2 ডায়াবেটিস-এর লক্ষণ গুলি টাইপ 1 ডায়াবেটিস এর মতোই। কিন্তু টাইপ 2 ডায়াবেটিসের সূত্রপাত সাধারণত ধীর গতিতে হয়। লক্ষণগুলিইও টাইপ 1 ডায়াবেটিসের মতো স্পষ্ট ভাবে লক্ষণীয় হয় না। এই কারণে, অনেকে ভুলবশত অসতর্ক হন।

টাইপ 2 ডায়াবেটিসের লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে:

  • ধীরে গতিতে ক্ষতস্থান নিরাময় 
  • তীব্র তৃষ্ণা 
  • অতিরিক্ত প্রস্রাবের প্রবণতা
  • দ্রুত হারে ওজন হ্রাস
  • অপ্রীতিকর গন্ধের অনুভূতি 
  • হাতে এবং পায়ে ঝিনঝিন 
  • চুলকানি 
  • মূত্রনালীতে সংক্রমণ
  • ঝাপসা দৃষ্টি
  • মেজাজ পরিবর্তন
  • মাথাব্যথা
  • মাথা ঘোরা 
  • বগল এবং ঘাড়ের কাছে কালচে ছাপ

ডায়াবেটিসের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা

টাইপ 1 ডায়াবেটিস চিকিৎসা:

টাইপ 1 ডায়াবেটিস ইনসুলিন ইনজেকশন গ্রহণ করে বা ইনসুলিন পাম্প বা অন্য ডিভাইস ব্যবহার করে চিকিৎসা করা হয়। বাইরে থেকে প্রয়োগ করা (ইঞ্জেকটেড) ইনসুলিন কোষে শর্করা যাতায়াতের চাবি হিসাবে কাজ করে। শরীরের কোষগুলিতে গ্লুকোজ প্রবেশ করে। অবশ্য ইনসুলিন নেওয়ার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ হল কতটা ইনসুলিন নিতে হবে তা সঠিকভাবে জানা কঠিন। এর পরিমাণ অনেক কারণের উপর নির্ভর করে, যেমন-

  • খাদ্যাভাস
  • ব্যায়াম
  • মানসিক চাপ
  • আবেগ এবং সাধারণ স্বাস্থ্য

ইনসুলিনের কী ডোজ গ্রহণ করা হবে তা নির্ধারণ করা একটি জটিল কাজ। যদি কেউ অত্যধিক ইনসুলিন গ্রহণ করেন, তাহলে তার রক্তে শর্করার মাত্রা বিপজ্জনক ভাবে নিম্ন স্তরে নেমে যেতে পারে। এটিকে হাইপো-গ্লাইসেমিয়া বলা হয়। এতে জীবনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

একই ভাবে যদি প্রয়োজনের থেকে খুব কম পরিমাণ ইনসুলিন গ্রহণ করা হয় তবে রক্তে শর্করার মাত্রা বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যেতে পারে। কিন্তু কোষগুলিতে শর্করার অভাব দেখা দেয়। একে হাইপার-গ্লাইসেমিয়া বলা হয়। এই অবস্থাতে-ও জীবনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

টাইপ 2 ডায়াবেটিসের চিকিৎসা:

এই ধরনের ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিক করার জন্য শরীরের মধ্যে তৈরি হওয়া ইনসুলিনকে ভালোভাবে ব্যবহার করার উপায় বের করা হয়। চিকিৎসকরা খাদ্য, ব্যায়াম এবং ওজন হ্রাসের উপর জোর দেন। যদি এর পরেও রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকে, তাহলে শরীরে ইনসুলিন ব্যবহারের দক্ষতা বাড়াবার

সচরাচর জিজ্ঞাস্য

প্রঃ ডায়াবেটিসে কি কি খাবেন না?

ডায়াবেটিসে কখনই শরীরের প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাওয়া চলবে না। বিশেষত, 

  • যেসব খাদ্য বা পানীয়তে শর্করার পরিমাণ বেশি থাকে সেসব বর্জন করতে হবে।
  • কাঁচা লবণ খাওয়া এড়াতে হবে। 
  • বেশি ভাজা ও তৈলাক্ত খাবার এড়িয়ে যেতে হবে। 
  • অতিরিক্ত চা বা কফি পান বারণ। 
  • ফ্যাট-যুক্ত দুধ বা দুগ্ধজাত খাবার বর্জন করতে হবে। 
  • ভাত, আলু, কলা এবং গাজরে শর্করা বেশি থাকে। সুতরাং এই খাবার গুলি খাওয়া নিয়ন্ত্রন করতে হবে।

ডায়াবেটিসে কোন কোন ফল খাওয়া উচিত?

নিম্নলিখিত ৭ টি ফল ডায়াবেটিসে খাওয়া চলে -

  • আপেল
  • অ্যাভোকাডো
  •  পেঁপে
  • বেরি জাতীয় ফল
  • কামরাঙা
  • নাশপাতি
  • কমলা

সুগার এবং ডায়াবেটিস-এর মধ্যে পার্থক্য কি?

ব্লাড সুগার বা গ্লুকোজ হল আমাদের রক্তে অবস্থিত শর্করা বা চিনি। এই শর্করা আমাদের খাবার থেকে আসে এবং এটি শরীরের শক্তির প্রধান উৎস। শরীরে শক্তির চাহিদা পূরণের জন্য, রক্ত শরীরের প্রত্যেকটি কোষে গ্লুকোজ বহন করে। ডায়াবেটিস হল এমন একটি রোগ যেখানে রক্তে এই শর্করার ভারসাম্য বজায় থাকেনা।


বেশি বেশি চিনি খেলেই কি ডায়াবেটিস হয়?

মিষ্টিজাতীয় খাবার বেশি খেলে ডায়াবেটিস হয়, এমন একটি ধারণা বেশ প্রচলিত

ডায়াবেটিস হলে আক্রান্ত ব্যক্তিকে প্রথমেই বলা হয় যে চিনিযুক্ত বা মিষ্টিজাতীয় কোন খাবার খাওয়া যাবে না।

আর ঠিক এই কারণেই এমন একটি ধারণাও বেশ প্রচলিত যে ডায়াবেটিস হওয়ার অন্যতম বড় কারণ মিষ্টিজাতীয় খাবার বেশি খাওয়া।

কিন্তু এই ধারণা আসলে কতটুকু সত্য?

চিনি বেশি খেলে কি সত্যিই ডায়াবেটিস হয়?

ডায়াবেটিস কী?

ডায়াবেটিস এমন একটি শারীরিক অবস্থা যার কারণে আক্রান্ত ব্যক্তির রক্তে শর্করার মাত্রা অনেক বেশি বেড়ে যায়। এতে একবার কেউ আক্রান্ত হলে সারা জীবনের জন্যে তা বয়ে বেড়াতে হয়।

খাবার খাওয়ার পর শরীর সেই খাবারের শর্করাকে ভেঙে চিনিতে (গ্লুকোজ) রুপান্তরিত করে। আর এটি শরীরে শক্তির যোগান দেয়।

তবে ডায়াবেটিস হলে শরীরের কোষগুলো আগে যে চিনিকে জ্বালানি বা শক্তিতে পরিণত করতো, সেই চিনি কোষের পরিবর্তে রক্তের মধ্যে জমা হতে শুরু করে। ফলে ডায়াবেটিস হয়।

ইন্টারন্যাশনাল ডায়াবেটিস ফেডারেশনের দেয়া সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ডায়াবেটিস এমন এক দীর্ঘস্থায়ী অবস্থা যার ফলে শরীর কার্যকরভাবে ইনসুলিন হরমোন তৈরি করতে পারে না।

“ডায়াবেটিস হলে মানুষের শরীরে গ্লুকোজ স্থায়ীভাবে বেড়ে যায়। আর কোন ধরনের প্রতিকার না নেয়া হলে এটা বাড়তেই থাকে। ফলে অনেক জটিলতা তৈরি হয়”, বলেন বাংলাদেশ ডায়াবেটিস সমিতির সভাপতি ও জাতীয় অধ্যাপক একে আজাদ খান।

ডায়াবেটিস হলে কেবল চিনিই না, আরও অনেক বিপাকীয় সমস্যা তৈরি হয়। তবে রক্তে চিনির পরিমাণ মেপে ডায়াবেটিস পরীক্ষা করা হয় বলে এটি নিয়েই বেশি আলাপ-আলোচনা হয় বলে মনে করেন এই চিকিৎসক।

বাংলাদেশে এক কোটিরও বেশি মানুষ ডায়াবেটিক

ইন্টারন্যাশনাল ডায়াবেটিস ফেডারেশনের হিসেবে বর্তমানে বিশ্বের ৫৩ কোটিরও বেশি মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, আর এতে প্রতি বছর মৃত্যু হয় ৬৭ লাখ মানুষের।

এর মধ্যে আক্রান্তদের তিন-চতুর্থাংশ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের নাগরিক।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে ২০২৩ সালে প্রকাশিত ডায়াবেটিস চিকিৎসার জাতীয় নির্দেশিকায় দেয়া তথ্যমতে, ডায়াবেটিসে আক্রান্তের সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে অষ্টম।

বাংলাদেশে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৩১ লাখ। এদের মধ্যে ২০ থেকে ৮০ বছর বয়সীদের মধ্যে ১৪ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ এই রোগে ভুগছেন।

কত ধরনের ডায়াবেটিস আছে?

ডায়াবেটিস হয় মূলত দুই ধরনের। এগুলো হলো টাইপ-১ ডায়াবেটিস ও টাইপ-২ ডায়াবেটিস।

টাইপ-১ ডায়াবেটিস মূলত জেনেটিক বা বংশগত। বাহ্যিক কোন কারণে কেউ টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয় না।

যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিরোধ কেন্দ্র সিডিসি ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, অটোইমিউন প্রতিক্রিয়ার কারণেই কোন ব্যক্তি টাইপ ১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়। অর্থাৎ শরীর ভুল করে নিজেকে আক্রমণ করে।

এর ফলে শরীর নিজেই ইনসুলিন তৈরি বন্ধ করে দেয়।

ডায়াবেটিস আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় পাঁচ থেকে ১০ শতাংশ মানুষের টাইপ ১- ডায়াবেটিস আছে। একজন মানুষের যেকোনো বয়সে এই টাইপটি ধরা পড়তে পারে।

“একজনের পরিবারের কারও ডায়াবেটিস আছে, তার মানে ওই ব্যক্তির ডায়াবেটিস হবার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু সম্ভাবনা থাকলেই যে হবে এমনটা না।"

"কেউ যদি শারীরিক পরিশ্রম না করে, মুটিয়ে যায়, বিশেষ করে পেট মোটা হয়ে যায়- তাহলে তার ডায়াবেটিস হবে”, বলেন ড. খান।

স্থূলতার কারণে ডায়াবেটিস হতে পারে।


টাইপ ১- ডায়াবেটিসে কেউ আক্রান্ত হলে শুরুতেই লক্ষণগুলো দেখা যায়। কারও যদি এই ডায়াবেটিস থাকে, তবে বেঁচে থাকার জন্য তাকে প্রতিদিন ইনসুলিন নিতে হয়।

টাইপ ১- ডায়াবেটিস প্রতিরোধের উপায় এখনো আবিষ্কার হয়নি।

অন্যদিকে টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্তের কারণ হলো অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন।

ডায়াবেটিস রোগীদের বেশির ভাগই টাইপ ২-তে আক্রান্ত হয়। সিডিসির হিসেব মতে, তা ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ।

সাধারণত বহু বছর ধরে এই টাইপের ডায়াবেটিস শরীরে দানা বাঁধে এবং প্রাপ্তবয়স্ক হবার পর তা ধরা পড়ে।

“টাইপ ২-ডায়াবেটিসের শুরুতে সাধারণত উপসর্গ থাকে না। বরং (শরীরের ভেতরেই) বিভিন্ন জটিলতার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়” বলেন জাতীয় অধ্যাপক ড. খান।

সুস্থ জীবনযাপন যেমন- ওজন কম রাখা, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া এবং শরীরকে সক্রিয় রাখার মাধ্যমে টাইপ-২ ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করা যেতে পারে।

ডায়াবেটিসের কারণে কী ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে?

রক্তে চিনির পরিমাণ বেশি হলে রক্তনালীর মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে।

শরীরে যদি রক্ত ঠিক মতো প্রবাহিত হতে না পারে, যেসব জায়গায় রক্তের প্রয়োজন সেখানে যদি এই রক্ত পৌঁছাতে না পারে, তখন স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

এর ফলে মানুষ দৃষ্টি শক্তি হারাতে পারে। ইনফেকশন হতে পারে পায়ে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, অন্ধত্ব, কিডনি নষ্ট হয়ে যাওয়া, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক ইত্যাদির পেছনে একটি বড় কারণ ডায়াবেটিস।


চিনির সঙ্গে ডায়াবেটিসের কী সম্পর্ক?

চিনি বেশি খাওয়ার সঙ্গে ডায়াবেটিস হওয়ার সরাসরি কোনও যোগসূত্র নেই। তবে চিনি বা মিষ্টিজাতীয় খাবার ডায়াবেটিস হবার ক্ষেত্রে পরোক্ষ প্রভাবক হিসেবে কাজ করে।

“চিনি খাওয়ার সঙ্গে ডায়াবেটিস হওয়ার যেমন সরাসরি সম্পর্ক নাই- এটা যেমন সত্য, আপনি যদি বেশি মিষ্টি খেতে অভ্যস্ত হন, তাহলে মুটিয়ে যেতে পারেন।"

"আর মুটিয়ে গেলে পরোক্ষভাবে তা ডায়াবেটিস হতে সাহায্য করবে” বলেন বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি ও জাতীয় অধ্যাপক একে আজাদ খান।

যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য বিষয়ক ওয়েবসাইট মেডিক্যাল নিউজ টুডে’তে বলা হয়েছে, প্রচুর চিনি খাওয়ার কারণে সরাসরি ডায়াবেটিস হয় না।

কিন্তু এটি স্থূলতা, হৃদরোগ এবং ডায়াবেটিসের সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

ফলে ওই ব্যক্তি সহজেই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হতে পারে।

যে সব লক্ষণ দেখলে সতর্ক হতে হবে:

ডায়াবেটিস হলে সাধারণত মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। ফলে এর নির্দিষ্ট কোন লক্ষণ না থাকলেও শরীরে বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্যের উপস্থিতি ডায়াবেটিসের জানান দিতে পারে। যেমন-

  • ঘনঘন প্রস্রাব হওয়া ও পিপাসা লাগা
  • দুর্বল লাগা ও ঘোর ঘোর ভাব আসা
  • ক্ষুধা বেড়ে যাওয়া
  • সময়মতো খাওয়া-দাওয়া না হলে রক্তের শর্করা কমে যাওয়া
  • মিষ্টি জাতীয় জিনিসের প্রতি আকর্ষণ বেড়ে যাওয়া
  • কোন কারণ ছাড়াই ওজন অনেক কমে যাওয়া
  • শরীরে ক্ষত বা কাটাছেঁড়া হলেও দীর্ঘদিনেও সেটা না সারা
  • চামড়ায় শুষ্ক, খসখসে ও চুলকানি ভাব
  • বিরক্তি ও মেজাজ খিটখিটে হয়ে ওঠা
  • চোখে কম দেখতে শুরু করা

নিয়মিত হাঁটাহাঁটি ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে পারে

কী করলে ডায়াবেটিস ঠেকানো যায়?

কেউ যদি বংশগতভাবে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়, তবে খুব বেশি কিছু করার থাকে না। তবে পারিপার্শ্বিক প্রভাবের ক্ষেত্রে কিছু বিষয় মেনে চললে ডায়াবেটিস ঠেকানো যেতে পারে। যেমন-

১. প্রতিদিন এক ঘণ্টা হাঁটা

বর্তমান সময়ে জীবনযাপনের ধরনের কারণে খুব কম সংখ্যক মানুষ কায়িক পরিশ্রম করেন। আর এই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হবার প্রবণতাকে উসকে দেয়।

ড. খান বলেন, এজন্য প্রতিদিন নিয়ম করে অন্তত এক ঘণ্টা হাঁটতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত ব্যায়ামের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। খেলাধুলা বাড়ানো যেতে পারে।

২. জীবনধারা বদলানো

এছাড়া যাদের পরিবার বা বাবা-মায়ের ডায়াবেটিস হওয়ার ইতিহাস রয়েছে, তাদের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার আগেই জীবনযাপনের ধরন পাল্টানো উচিত।

যেমন- নিয়মিত খাবার খাওয়া, নিয়ম মেনে সকালে ঘুম থেকে ওঠা এবং রাতে ঘুমাতে যাওয়া, যানবাহন ব্যবহার কমিয়ে হাঁটাচলা বাড়ানো, মিষ্টি জাতীয়, ফাস্টফুড ও তৈলাক্ত খাবার পরিহার করা ইত্যাদি।

৩. ধূমপান ও মদ্যপান ছেড়ে দেয়া

ডায়াবেটিস রোগ ঠেকাতে যেসব খারাপ অভ্যাস সবার আগে বাদ দিতে হবে, তার মধ্যে রয়েছে ধূমপান ও মদ্যপানের অভ্যাস। কারণ এগুলো ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বাড়িয়ে দেয়।

৪. অস্বাস্থ্যকর খাবার বাদ দেয়া

সাধারণ মিষ্টিজাতীয় খাবার, প্রক্রিয়াজাত খাবার, ফাস্টফুড, কোমল পানীয়, ভারী খাবার স্থূলতার ঝুঁকি অনেক বাড়িয়ে দেয়। ফলে শরীরের ওজনের দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে, যাতে কোনভাবেই অতিরিক্ত ওজন বা মুটিয়ে যাওয়া না হয়।

এজন্য বিশেষজ্ঞরা এ ধরনের খাবার যথাসম্ভব এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেন।

এছাড়া এক বেলা পেট ভরে না খেয়ে পরিমাণে অল্প অল্প করে বিরতি দিয়ে খাওয়া।

৫. রক্তে চিনির মাত্রার ওপর নজর রাখুন

যাদের শিশুর ঘনিষ্ঠ স্বজনদের ডায়াবেটিসের ইতিহাস রয়েছে, তাদের বছরে অন্তত একবার করে পরীক্ষা করাতে হবে।

সেই সঙ্গে বছরে অন্তত একবার লিপিড প্রোফাইল ও রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রাও পরীক্ষা করে দেখতে হবে।

ফলে ডায়াবেটিস আক্রান্ত হলেও দ্রুত তা শনাক্ত হবে।

তবে সব চেষ্টা সত্ত্বেও কারও কারও ডায়াবেটিস হতে পারে। সে ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তি যদি ডায়াবেটিসকে সম্পূর্ন নিয়ন্ত্রণে রাখে, তাহলে তিনি একদম সুস্থ স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারবেন বলে জানান ড. খান।